By October 9, 2017 Read More →

৮টি ধাপে ডিজাইন করুন একটি কার্যকর ট্রেনিং প্রোগ্রাম

আমাদের প্রায় প্রত্যেকেই জানি একটা প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্রেইনিং বা প্রশিক্ষনের গুরুত্ব অনেক। প্রশিক্ষনের মাধ্যমে শ্রমিক ও কর্মীদের দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন সহজ করে তোলা যায়। একটি কার্যকর প্রশিক্ষনের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থাৎ আয় এবং মুনাফা বৃদ্ধি করা যায়, পাশাপাশি একটি সন্তুষ্ট কর্মীবাহিনী তৈরী হয়, এমপ্লয়ী টার্নওভার কমে – এরকম অনেক কিছুই অর্জিত হয়।

কিন্তু “কার্যকর” বা Effective ট্রেইনিং মডিউল তৈরী করা এত সহজ নয়। আসুন বাস্তব উদাহরনসহ জানি, একটি “কার্যকর” ট্রেইনিং মডিউল তৈরী করার উপায়।

১. ট্রেইনিং নিড এসেসমেন্ট (TNA – Training Need Assessment) পারফর্ম করুন

একটি বাস্তব ঘটনাকে উদাহরন হিসেবে ধরা যাক, কোনো একটা গার্মেন্টস ওয়াশ ফ্যাক্টরীতে মাইগ্রেশন খুব বেশী। প্রোডাকশন ম্যানেজারের বক্তব্য হচ্ছে তারা নতুন লোক নেন, কাজ শেখান, ২/৩ মাস পর আশেপাশের অন্য ফ্যাক্টরী তাদের কিছু টাকা বেশী বেতন দিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যায়।

এখন, প্রশিক্ষনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে চাইলে প্রথমেই একটা TNA করতে হবে।

একটা TNA-তে মূলত চারটি ধাপ থাকে।

ক) প্রতিষ্ঠানের “বিজনেস গোল” ক্লিয়ারলি আইডেনটিফাই করা (এক্ষেত্রে মাইগ্রেশন কমানো)।

খ) এই বিজনেস গোলটি অর্জন করতে হলে প্রশিক্ষনার্থীদের যে কাজটি করতে হবে সেটি আইডেনটিফাই করা (এক্ষেত্রে, তারা চাকরী ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবে না)।

গ) প্রশিক্ষনের বিষয় বস্তু চিহ্নিত করা, যেভাবে প্রশিক্ষন দিলে প্রশিক্ষনার্থীরা কাজটি করবে (এক্ষেত্রে শ্রমিকদের বোঝাতে হবে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানে গেলে কি ক্ষতি, থেকে গেলে কি লাভ)।

ঘ) প্রশিক্ষনার্থীদের শেখার প্রবনতা খুঁজে বের করা যাতে প্রশিক্ষনটি কার্যকর হয় (এক্ষেত্রে শ্রমিকদের পছন্দমত উপায়ে কথা বলতে হবে)।

শুনতে বা পড়তে খুব সহজ মনে হলেও ব্যাপারটি সব সময় সোজা হয়ে ওঠেনা। মনে রাখবেন, যদি একদম পরিস্কার কোনো বিজনেস গোল না থাকে, তবে ট্রেইনিং পারফর্ম করার কোনো মানে নেই।

২. পরিনত বয়স্ক মানুষদের চিন্তাধারা ও মানসিকতা মাথায় রাখুন

এটা একটি ট্রেইনিং প্রোগ্রাম তৈরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি ধাপ। একটি শিশুকে যত সহজে একটা জিনিস শেখানো যায়, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে শেখানো ততই কঠিন।

পূর্নবয়স্ক মানুষদের কোনো কিছু সম্পর্কে প্রশিক্ষন দেয়ার কিছু মূল নিয়ম আছে। মনে রাখবেন, এই নিয়মগুলো অবহেলা করে একটি ট্রেনিং দেয়া মানে জাস্ট পয়সার অপচয় ছাড়া আর কিচ্ছু না।

পূর্নবয়স্ক মানুষদের কোনো কিছু সম্পর্কে প্রশিক্ষন দেয়ার মূল নিয়মগুলো হলো –

– পূর্নবয়স্ক মানুষদের সহজে পরিচালনা করা যায় না, তারা নিজেদের বুদ্ধি ও ইচ্ছা অনুযায়ি পরিচালিত হয়।

– তারা সারা জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, মেধা ও মতামত সাথে নিয়ে প্রশিক্ষনে আসে

– তারা “গোল-ওরিয়েন্টেড”

– তারা প্রাসংগিক প্রশিক্ষন চায়

– তারা তাদের কাজের সংগে সম্পর্কযুক্ত প্রশিক্ষন চায়

– তারা তখনই শিখতে চায় যখন তারা দেখে এতে তাদের উপকার হবে

– তারা চায় তাদের ও তাদের মতামতকে সম্মান দেখানো হোক

এখন, আমরা যদি আমাদের কেইসটা একটু পর্যালোচনা করি, আমাদের এখানে যারা প্রশিক্ষনার্থী, তারা ওয়াশ ফ্যাক্টরীর শ্রমিক (মূলত, অপারেটর ও সহকারী অপারেটর)। এদের বয়স ১৮ থেকে ৪০/৪৫ বছর। খুব নিশ্চিতভাবেই বলা চলে, উপরের প্রত্যেকটি ব্যাপারই তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

৩. ট্রেইনিং-এর উদ্দেশ্য বা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন বা চাহিদাটি স্থির করুন

এখানে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা হল শ্রমিকদের মাইগ্রেশন কমানো। অর্থাৎ, তাদের বোঝাতে হবে, তারা মাইগ্রেট করলে তাদের ক্ষতি, তারা থেকে গেলে তাদেরই ভালো।

৪. মডিউলটি তৈরী করুন

এখন কাজ হচ্ছে মডিউলটির বেসিক স্ট্রাকচার তৈরী করা।

আমাদের আলোচনার প্রতিষ্ঠানটি একটি ওয়াশ ফ্যাক্টরী, এবং সৌভাগ্যবশতঃ, এটি একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা (LEED Platinum Certified)। এই কারখানায় শ্রমিকদের মোটামুটি আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য রয়েছে হরেক রকম সুবিধা।

তারপরও শ্রমিকরা সামান্য কিছু বেশী বেতনের জন্য অন্য কারখানায় চলে যায়। কেন? এই প্রশ্নের একটাই জবাব, শ্রমিকদের চোখে আংগুল দিয়ে দেখানো হয় না তাদের সুযোগ-সুবিধার পাল্লাটা কোন কারখানায় বেশী।

৫. মডিউলটি বিভিন্ন টুল (Tool) দ্বারা সমৃদ্ধ করুন

একটি ট্রেইনিং মডিউলকে বিভিন্নভাবে সাজানো যায়, এটা নির্ভর করে আপনি কিভাবে আপনার প্রশিক্ষনের বিষয় বস্তুকে উপস্থ্পন করতে চান।

এই ক্ষেত্রে পাওয়ারপয়েন্ট, এক্সেলশিট টাইপের সফটওয়্যারের ব্যবহার খুব কার্যকর। এছাড়াও প্রশিক্ষনার্থীদের মাঝ থেকে ২/৩ জনকে ডেকে অভিনয় করিয়ে, যেটাকে “Role Playing” বলা হয়, সেটাও করতে পারেন।

৬. ট্রেইনিং কনডাক্ট করুন

অাপনি প্রস্তুত, এখন ট্রেইনিংটি করার পালা।

আমাদের আলোচ্য কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান নিজেই এই ট্রেইনিংটি নেবেন বলে স্বিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি টোটাল ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের ৫০ জনের ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে ট্রেইনিং গুলো নেয়া শুরু করলেন।

“তোমরা গার্মেন্টস সেক্টরে কেন এসেছো? গার্মেন্টস সেক্টর কিন্তু ভালো জায়গা না” – এই ছিল তার বক্তব্যের ওপেনিং লাইন।

লক্ষ্য করুন, কথাটা খুব একটা পজিটিভ স্টেটমেন্ট না হলেও, এই একটা স্বীকারোক্তি দিয়ে তিনি মুহূর্তেই শ্রমিকদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করে নিলেন।

এরপর তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ননা করা শুরু করলেন, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে কাজ করলে কি কি রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে। বাদ পড়লোনা রানা প্লাজা বা তাজরীন ফ্যাশনস-এর প্রসংগ-ও। মোট কথা, তিনি খুব সাজিয়ে গুছিয়ে যুক্তি দিয়ে এটা প্রমান করলেন, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলোতে কাজ করা মোটেই বুদ্ধিমানের মত কাজ নয়।

এরপর তিনি শুরু করলেন “ওয়াশ ফ্যাক্টরী” নিয়ে তার বক্তব্য। তার মতে, ওয়াশ ফ্যাক্টরীগুলো হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক জায়গা, কারন এখানে সার্বক্ষনিকভাবে কাজ করতে হয় বিভিন্ন কেমিক্যাল নিয়ে। এগুলো বিষ ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং, শ্রমিকদের পক্ষে “ওয়াশ ফ্যাক্টরী”-তে কাজ করা আর আত্মহত্যা করার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।

এই টুকু বলেই তিনি বললেন – কিন্তু… আর এই কিন্তুর পরেই শুরু হলো তার আসল বক্তব্য।

তিনি ব্যাখ্যা করলেন, তাদের কারখানা বাংলাদেশের ২/১ টি ওয়াশ কারখানার একটি, যেটা পরিবেশবান্ধব। যেটাতে কাজ করলে কেমিক্যালের খারাপ প্রভাব শরীরের উপর পড়েনা। তিনি অংক করে বুঝিয়ে দিলেন, অন্য ফ্যাক্টরীতে গেলে আপাত দৃষ্টিতে কিছু বেতন বাড়লেও অন্যান্য সুবিধা কমে যায়, এর ফলে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হতে হয়…ইত্যাদি ইত্যাদি।

খুবই ব্যতিক্রমধর্মী একটি কৌশল, কিন্তু কার্যকরী। ২/৩ মাস পরে ঐ ফ্যাক্টরীর ওয়ার্কার মাইগ্রেশন নেমে এসেছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।

৭. ফিডব্যাক নিন

ট্রেইনিং তো নিচ্ছেন। কিন্তু কিভাবে বুঝবেন আপনার উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে কি না? ট্রেইনিং-এর পর প্রশিক্ষনার্থীদের কাছ থেকে মতামত নিন। শুধু তাই না, নজর রাখুন যে উদ্দেশ্যে আপনি প্রশিক্ষনটি দেয়া শুরু করেছিলেন, সেটি অর্জিত হচ্ছে কি না।

উপরের উদাহরনটিতে শ্রমিকদের মাইগ্রেশন কমে এসেছিল, সুতরাং আমরা বলতে পারি ট্রেইনিংটি সফল ছিল।

৮. প্রয়োজনীয় পরিমার্জন করুন

একই ট্রেইনিং আপনাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে পরিবর্ধিত, পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত করতে হতে পারে। হয়তো বিষয়বস্তুতে একটু পরিবর্তন আসলো, কিংবা প্রতিষ্ঠানের “বিজনেস গোল” একটু অন্যরকম হল, কিংবা প্রশিক্ষনার্থীদের টাইপ পরিবর্তিত হল। সুতরাং যে কারনেই হোক না কেন, আপনাকে মডিউল পরিবর্তন করতে হতে পারে, আপগ্রেড করতে হতে পারে। ব্যাপারটি জরুরী, কারন তা না হলে কোনো এক সময়ে খুব কার্যকর একটি ট্রেইনিং মডিউল-ও একসময় অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

অাজ এ পর্যন্তই। আশা করি লেখাটি আপনাদের কাজে আসবে। ধন্যবাদ।

Comments

comments

About the Author:

মোঃ শরিফুল হাসান - মানবসম্পদ, প্রশাসন ও কমপ্লায়েন্স প্রফেশনাল, লেখক, পরামর্শক।

Comments are closed.

error: Content is protected !!