By January 24, 2018 Read More →

শ্রমিক, তদারকি কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি – সংজ্ঞা, কিছু জরুরী প্রশ্ন ও ব্যাখ্যাসহ উত্তর

শ্রম আইনের যে কয়টি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশী বিতর্ক, যেসব বিষয়ের সংজ্ঞা নিয়ে সবচেয়ে বেশী ধোঁয়াশা, যে বিষয়গুলোর অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেনীর মালিক ও আইনজীবিরা হাজার হাজার কর্মকর্তাকে তাদের আইনগতভাবে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রয়াস পান, তাদের মধ্যে শ্রমিক, তদারকি কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি – এই তিনটি অন্যতম।

কর্মকর্তারাও কি শ্রমিক? কর্মকর্তারা কি শ্রম আইনের আওতাভূক্ত? শ্রমিকদের জন্য প্রাপ্য সুবিধাগুলো কি কর্মকর্তারা পাবেন না? কর্মকর্তারা কি ওভারটাইম পাওয়ার যোগ্য? তারা কি সার্ভিস বেনিফিট পাবেন? আসুন, জেনে নেয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর।

শ্রমিক, তদারকি কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি – সংজ্ঞাসমূহ

শ্রমিক কারা?

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর (২০১৩ সালের সংশোধনীসহ) প্রথম অধ্যায়ের ২য় ধারায় ৬৫ অনুচ্ছেদের সংজ্ঞা অনুযায়ি, শ্রমিক অর্থ শিক্ষাধীন সহ কোন ব্যক্তি, তাহার চাকুরীর শর্তাবলী প্রকাশ্য বা উহ্য যে ভাবেই থাকুক না কেন, যিনি কোনো প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরিভাবে বা কোন ঠিকাদার, যে নামেই অভিহিত হইক না কেন, এর মাধ্যমে মজুরী বা অর্থের বিনিময়ে কোন দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরী, ব্যবসা উন্নয়ন অথবা কেরানীগিরির কাজ করার জন্য নিযুক্ত হন, কিন্তু প্রধানতঃ প্রশাসনিক, তদারকি কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি ইহার অন্তর্ভূক্ত হইবেন না।

আইনের ভাষা একটু জটিল হয় সব সময়, তাই এই ভাষার মারপ্যাঁচে যাতে বিভ্রান্তি না তৈরী হয়, সে জন্য এটার ইংলিশ ট্রান্সলেশনটুকুও দিয়ে দিলাম।

তাহলে, কোনো প্রতিষ্ঠানে মজুরীর ভিত্তিতে আপনি “এমপ্লয়েড” হলে আপনি শ্রমিক, যদি না আপনার চাকুরীটি তদারকিমূলক (ম্যানেজেরিয়াল), প্রশাসনিক (এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ) কিংবা ব্যবস্থাপনামূলক (সুপারভাইজরি) হয়ে থাকে।

এখন তদারকি কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কারা? শ্রম আইন ২০০৬ ও এর ২০১৩ সালের সংশোধনীতে এর উত্তর পাওয়া যায়না। কিন্তু ২০১৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ শ্রম বিধিতে (প্রথম অধ্যায়, ২ ধারার উপধারা ১ -এ “ছ” ও “ঞ” অনুচ্ছেদ) এই দুই শ্রেনীর সংজ্ঞা দেয়া আছে।

“তদারকি কর্মকর্তা” অর্থ মালিক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এমন কোনো ব্যক্তি যিনি উক্ত ক্ষমতাবলে কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের কোন শাখার কোনো কাজের বা সেবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন, কাজের পরিধি নিয়ন্ত্রন, বাস্তবায়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন, কাজের মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা, শ্রমিকের দিক নির্দেশনা প্রদান বা তদারকি করেন।

এবং “প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি” অর্থ মালিক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি যিনি উক্ত ক্ষমতাবলে কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক বা কর্মচারীদের নিয়োগ, বেতন ও ভাতাদি নির্ধারন, চাকরীর অবসান বা চাকুরী হইতে অপসারন, চুড়ান্ত পাওনাদি পরিশোধ এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যয় অনুমোদন বা নিয়ন্ত্রন কাজে নিয়োজিত।

সুতরাং, বলা যেতে পারে, আগে অামরা মোটা দাগে একটি কারখানায় বা প্রতিষ্ঠানে দুইটি শ্রেনীবিভাজন দেখতাম – মালিক ও শ্রমিক। কিন্তু ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখের পর থেকে শ্রেনীবিভাজন হবে চারটি – মালিক, প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি, তদারকি কর্মকর্তা ও শ্রমিক।

কিন্তু কোনো ভাবেই “প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি” এবং “তদারকি কর্মকর্তা”-দের মালিক-শ্রেনীভূক্ত করার সুযোগ নেই।

মালিক হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের মালিক (Owner) এবং বাকি তিন শ্রেনী হচ্ছে কর্মী (Employee অর্থাৎ Employed Person)।

এখন আসি কিছু প্রাসংগিক প্রশ্নে, যেগুলোর উত্তর জানা জরুরী।

প্রশ্ন – ১ঃ বাংলাদেশ শ্রম অাইন কি শুধু শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য?

উত্তর হল – না।

প্রথমেই বুঝতে হবে, এটা শ্রম আইন, শ্রমিক আইন নয়। এটা একটি প্রতিষ্ঠানের সংগে সম্পর্কযুক্ত সবার জন্যই প্রযোজ্য। একটি প্রতিষ্ঠানে মালিকের বা কর্মীর কর্তব্য কি, দায় কি, অধিকার কি – সবই আছে এই আইনে। কি করা যাবে আর কি যাবে না তা বলা আছে পরিস্কার ভাবে। এমনকি, যা করা যাবে না, সেটা করলে অপরাধের শাস্তির পরিমানও উল্লেখ আছে, কর্মীর জন্যও, মালিকের জন্যও। কর্মী বলতে এখানে প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি, তদারকি কর্মকর্তা ও শ্রমিক, সবাই অন্তর্ভূক্ত।

শুধু মালিক বা কর্মীই নয়, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকার, সরকারী দপ্তরসমূহ, এমনকি আদালতের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতা সম্পর্কিত দিক নির্দেশনাও আছে এই অাইনে, যেগুলো মেনে চলতে সবাই বাধ্য।

প্রশ্ন – ২ঃ কেউ কেউ বলেন, শ্রম আইন কর্মকর্তাদের জন্য নয়, তাদের জন্য আছে কোম্পানী পলিসি – এটা কতটুকু সত্যি?

উত্তর হল – কথাটা একই সংগে পুরোপুরি সত্য এবং ডাহা মিথ্যা, নির্ভর করে যে বলে তার উদ্দেশ্য সৎ না অসৎ তার উপর।

একটি কারখানার বা প্রতিষ্ঠানের সবার জন্যই শ্রম আইন ২০০৬, ২০১৩ সালের সংশোধনী এবং ২০১৫ সালের শ্রমবিধি প্রযোজ্য। কিন্তু আইনের কিছু অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেনীর মালিক ও তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকারী জ্ঞানপাপীরা এই বিষয়টির অপব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার করতো যে শ্রম আইন কর্মকর্তাদের (তথাকথিত “স্টাফ”) জন্য প্রযোজ্য নয়, সুতরাং তারা সার্ভিস বেনেফিট পাবার অধিকারী নন। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মকর্তাদের জন্য মনগড়া মানবসম্পদ নীতিমালা বা এইচ.আর. পলিসি তৈরী করা হত, যাতে কর্মকর্তাদের জন্য সার্ভিস বেনেফিট বা গ্রাচুইটির অবকাশ থাকতো না।

কিন্তু ২০১৫ সালের শ্রমবিধিতে এ বিষয়টি পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করা আছে।

প্রথম কথা, সকল কর্মকর্তা “প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি” বা “তদারকি কর্মকর্তা” নন। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি বা তদারকি কর্মকর্তা-রা শ্রমিক না হলেও যে তাদের এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ পাওয়া গেল, তাও নয়।

বরং, যদি কোন প্রতিষ্ঠান স্টাফদের শ্রম আইনের আওতায় না ফেলতে ইচ্ছুক হন, তবে তাদের চাকুরী বিষয়ক নীতিমালা তৈরী করতে হবে। কিন্তু পার্থক্যটা হল, মনগড়া কোনো নীতিমালা বা পলিসি করলে এখন আর হবে না। কোন প্রতিষ্ঠান নিজস্ব চাকুরীবিধি বা এইচ.অার. পলিসি তৈরী করতে চাইলে সেটাকে অবশ্যই কল-কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে।

শ্রম বিধির ২য় অধ্যায়ের ধারা ৩-এর উপধারা ২ ও ৩ দেখুন।

সুতরাং, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি শ্রমিকদের থেকে কর্মকর্তাদের অালাদা সুবিধা দিতে চায় তবে দিতে পারে, কিন্তু সেটা কোনমতেই শ্রমিকদের দেয়ার নিয়ম হতে কম দেয়া যাবে না, না দেয়ার তো প্রশ্নই নেই। বেশী দিতে চাইলে আইনের চোখে কোনো বাধা নেই।

আশা করি অাইনের সব অস্পষ্টতা দূর হয়েছে এই পোস্টে। তারপরও যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

যদি বাংলাদেশ শ্রম আইন ও শ্রম বিধি সম্পর্কে অাপনি উৎসাহী হন, তবে যোগ দিতে পারেন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে, এখানে

Comments

comments

About the Author:

মোঃ শরিফুল হাসান - মানবসম্পদ, প্রশাসন ও কমপ্লায়েন্স প্রফেশনাল, লেখক, পরামর্শক।

Comments are closed.

error: Content is protected !!