By October 12, 2017 Read More →

প্রিয় গার্মেন্টস / উৎপাদন কারখানার মালিকগন, দয়া করে আপনাদের কর্মকর্তাদের ঠকানো বন্ধ করুন

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সেইসব হাতে গোনা গুটিকয়েক গার্মেন্টস কিংবা অন্য কারখানার মালিকদের কাছে, যারা এই লেখার আওতায় পড়েন না। আপনাদের অস্তিত্ব রূপকথার ইউনিকর্নদের মতই দূর্লভ, বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ গার্মেন্টস ও অন্যান্য কারখানার কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাদের জানাচ্ছি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাবনত ভালোবাসা, অাশীর্বাদ।

বাকি যারা আছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলছি, দয়া করে আপনাদের কর্মকর্তাদের ঠকানো বন্ধ করুন।

শুধু শ্রমিকেরা বা কর্মচারীরা নয়, কর্মকর্তারাও মানুষ, এটা মনে রাখুন।

কথা গুলো খুব কড়া হয়ে গেল? তাহলে আসুন, লেখার শুরুটা বেশ কিছু উদাহরন দিয়ে শুরু করা যাক। কর্মকর্তাদের ও কারখানার ছদ্মনাম ব্যবহার করা হলেও প্রত্যেকটিই বাস্তব ঘটনা।

১. আব্দুর রহমান, বয়স ৩২ বছর, ৩ বছর বয়সী ফুটফুটে একটা মেয়ে সন্তান আছে তার। কাজ করেন একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরীর স্টোর ইন চার্জ হিসেবে। সাভারে অবস্থিত কারখানার নাম ধরে নিলাম শীতের পোষাক লিমিটেড।

আব্দুর রহমান সাহেব এই ফ্যাক্টরীতে আছেন প্রায় ৮ বছর। বেতন শুরুতে ছিল ৪০০০ টাকা। স্টোরকিপার হিসেবে ঢুকেছিলেন, স্টোর ইনচার্জ হয়েছেন গত বছর, বেতন সাকুল্যে ১৬০০০ টাকা। দেশের বাড়ী পাবনা, গ্রাজুয়েশন করেছিলেন বাংলায়, রেজাল্টের অপেক্ষা করেননি, এসে পড়েছিলেন ঢাকায় জীবিকার খোঁজে, অবশ্য রেজাল্ট আল্লাহর রহমতে খুব একটা খারাপ হয়নি, হায়ার সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছেন, যদিও সেই লেখাপড়া এখন আর কোনো কাজে আসে না।

আব্দুর রহমানের মোটামুটি দারিদ্র্যের মধ্যেই বসবাস, এত কম বেতনে সাভারে বাসা ভাড়া করে থাকা, খাওয়া, বাচ্চার পেছনে খরচ তো আছেই। তারপরও, হাঁপিয়ে ওঠা জীবন নিয়েও মুখ বুজে তিনি কাজটা করে যান। শুধু আজকাল তার মন টা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কারন আর কিছু না, আজকাল আর তার মেয়েটার সাথে সামান্যতমও সময় কাটানো হয়ে ওঠেনা তার। সকাল আটটায় তাকে কারখানায় ঢুকতে হয়, এসব ব্যাপারে ফ্যাক্টরীর মালিক আবার খুব কড়া। তার অনুগত এ্যাডমিন ম্যানেজার প্রতিদিন নিয়মমত সবার হাজিরা চেক করেন, দেরি হলে লাল কালির দাগ পড়ে নামের পাশে, তিনটি লাল দাগের মূল্য ১ দিনের বেতন, কোম্পানির নিজস্ব অাইন।

না, দেরী হয়না আব্দুর রহমানের, তার সামান্য বেতনের কিছুটাও জরিমানা দিতে পারার বিলাসিতা দেখানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যা অফিস থেকে বেরোনোয়। যতক্ষন ফ্যাক্টরীর ফ্লোর চলে, ততক্ষন পর্যন্ত তো বটেই, রাত ২/৩ টা পর্যন্তও তাকে ফ্যাক্টরীতে থাকতে হয় হর হামেশা। প্রায় প্রতিদিনই শিপমেন্ট থাকে। গাড়ী ভাড়া করা, গার্মেন্টসের বক্স গুনে গাড়ী লোড করা, পোর্টে না পৌঁছানো পর্যন্ত ফলো-আপ করা, কাজের তো শেষ নেই।

না, এই বাড়তি কাজের জন্য তাকে বাড়তি কোনো ওভারটাইম দেয়া হয়না, যা দেয়া হয়, তা দেয়া আর না দেয়া সমান। সে ওভারটাইম পাবে কেন? সে তো অার শ্রমিক নয়, সে হলো “স্টাফ”।

২. মোহাম্মদ আলী, বিবিএ করা, এমবিএ করছে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে, ফ্যাক্টরীর মানবসম্পদ বিভাগে জয়েন করেছেন একবছর হলো, বেতন ধরার সময় পরিচালক সাহেব বলেছিলেন, “কাজ করো, কাজ দেখে এক মাস বেতন ধরবো”।

বেতন তিনি ধরেছেন, ৬৫০০ টাকা। একবছর পরে বেড়েছে ১০০০ টাকা। বাসার পাশেই ফ্যাক্টরী, মাত্র ২৪ বছর বয়স, তাই এই ৭৫০০ টাকাই মোটামুটি মনে হয় মোহাম্মদ আলীর কাছে।

সেদিন সন্ধ্যায় শ্রমিকদের বেতন দিতে দিয়ে মনটা খারাপ হলো তার। একজন হেলপার, একেবারেই অশিক্ষিত, নামটা স্বাক্ষর করার জ্ঞানটুকুও নেই, শ্রম আইনের ছত্রছায়ায় তার বেতন ধরা হয়েছে ৫৩০০ টাকা, দুইটি ওটি শীটে, টিফিন বিলে, নাইট বিলে তার সর্বসাকুল্যে মাসিক অায় ১০ হাজার টাকার কাছাকাছি।

না, এই হেলপারের সাথেই মোহাম্মদ আলীকে অফিস ত্যাগ করতে হয়, কিন্তু এই বাড়তি পাওনাটুকু তার কপালে জোটেনা, কারন সে শ্রমিক নয়, সে একজন “স্টাফ”।

৩. গাজীপুরের এক বিশাল ওয়াশ কারখানা, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় বায়ারের কাজ চলে সেখানে। বিশাল বড় এক গ্রুপের অংশ এই ফ্যাক্টরী। এই গ্রুপেরই অন্য কারখানা গুলোতে জিন্সের প্যান্ট তৈরী হয়, সেই প্যান্টগুলোরই ধোলাই হয় এখানে। ধরা যাক এর নাম আম্বিয়া ওয়াশিং।

ও, আর একটা কথা, এই আম্বিয়া ওয়াশিং আবার একটি সবুজ কারখানা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে লীড সার্টিফিকেট পাওয়া।

এই ফ্যাক্টরীর প্রথম থেকেই প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন একজন ভদ্রলোক, মেজর (অব.) আরিফ। দীর্ঘ ১৮ বছর চাকরী করার পর অবসর নিয়েছেন তিনি। বিদায়কালে কোম্পানী তাকে হাসিমুখেই বিদায় দিয়েছে, কিন্তু মেজর (অব.) আরিফ-এর মুখে হাসি ছিলনা। খালি হাতেই তাকে যেতে হয়েছে।

১৮ বছরের সার্ভিস বেনেফিট যা পাওয়ার কথা ছিল, তিনি তার কিছুই পাননি। তিনি এটা নিয়ে তেমন কিছুই বলতে পারেননি, তিনি তো আর শ্রমিক নন যে শ্রম আদালতে গিয়ে মামলা করবেন!

৪. ইয়াকুব হোসেন, বয়স ৪৭ বছর, তিনটি ছেলে মেয়ে আছে, ১৫ বছর বয়সে মিরপুরের একটি গার্মেন্ট কারখানায় ঢুকেছিলেন হেল্পার হিসেবে, ৩২ বছর ধরে এক জায়গাতেই আছেন, কারখানার শুরু থেকেই। বলা চলে তার শ্রম আর ঘাম মিশে আছে কারখানার ইতিহাসে।

সঞ্চয় বলতে তেমন কিছু নেই, ৩২ বছরের অর্জন পি.এম. (প্রোডাকশন ম্যানেজার বা উৎপাদন ব্যবস্থাপক) পদবী আর ভার্সিটি ও স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়ে গুলো। জীবিকার তাগিদে তিনি স্কুলের গন্ডি পার করতে পারেননি, আশা তার ছেলেমেয়েরা যেন এই দূর্ভাগ্যের শিকার না হয়।

আজকাল দিন কাল ভালো যাচ্ছে না। চেয়ারম্যানের সাথে তার সম্পর্ক ও সমঝোতা খুব ভালো ছিলো, কিন্তু ইদানীং তার ছেলে এম.ডি. হয়ে এসেছেন ফ্যাক্টরীতে, ব্যবসা দেখা শুরু করেছেন। এম.ডি.-র সাথে বনছে না ইয়াকুব সাহেবের। তালও মেলাতে পারছেন না এম.ডি. সাহেবের নিত্য নতুন ধ্যান ধারনার সাথে।

মাস খানেক আগে একটা শিপমেন্ট-এ কিছু সমস্যা হলো, মার্চেন্ডাইজিং ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে সঠিক সময়ে বাটন পাওয়া যায়নি, তাই শিপমেন্ট শিডিউল মেইনটেইন করা সম্ভব হয়নি, এয়ার শিপমেন্টে কোম্পানীর গচ্চা গিয়েছে বেশ মোটা অংকের টাকা। গার্মেন্টস কারখানায় এই ধরনের ব্যাপার ঘটেই, কিন্তু এম.ডি. এই সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না, একদিন ডেকে একগাদা অভিযোগ শুনিয়ে পরদিন থেকে আসতে মানা করে দিলেন।

বাংলাদেশে বায়ারদের চাপেই হোক, আর যে কারনেই হোক, গার্মেন্টস সেক্টরে অনেক উন্নতি হয়েছে কর্মপরিবেশের, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শ্রম আইনে এসেছে শ্রমিকদের অধিকারের নিরাপত্তা। কিন্তু শ্রমিকের সংজ্ঞা নিয়েই যত সমস্যা।

মালিকের অনুমতি ছাড়া এক পয়সা খরচ করার কোনো উপায় নেই, নেই সামান্য কোনো স্বিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ। অথচ এক “তদারকি কর্মকর্তা”-র ফাঁদে ও কু-যুক্তিতে মালিকেরা মনে করেন “স্টাফ”-দের কোনো অধিকার নেই। মজার ব্যাপার, এই “তদারকি”-র কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও নেই।

সাধারন জ্ঞানে কি বলে জানেন, বাই ডেফিনেশন এন্ড মিনিং, একটা ফ্যাক্টরীর তদারকি কর্মকর্তা কারা? সুপারভাইজরগন। সুপারভাইজ শব্দটার মানেই তদারকি, আর যারা তদারকি করে, তাদের বলা হয় সুপারভাইজর। অলমোস্ট সব ফ্যাক্টরীতেই সুপারভাইজররা স্টাফ বা কর্মকর্তা, কিন্তু অবাক ব্যাপার হল, গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য প্রকাশিত ২০১৩ সালের “নূন্যতম মজুরি”-র গেজেটে সুপারভাইজর, লাইন চীফদের পরিস্কারভাবে শ্রমিক বলা হয়েছে।

বুঝলেন ঘটনাটা?

হাজার হাজার মামলার রায়কে রেফারেন্স হিসেবে ধরে বলা যায়, একজন পেইড এম.ডি. বা একজন মহাব্যবস্থাপককেও নির্দ্বিধায় শ্রমিক বলা যায়। কারন, একটু কমনসেন্স খাটান, একটা ব্যবসায় শুধু একটাই সম্পর্ক থাকে – মালিক আর মালিক নয় – মালিক আর শ্রমিক – এমপ্লয়ার ও এমপ্লয়ি।

ঠিক আছে, ভালো কথা, স্টাফরা শ্রমিক নয়, তার মানে এই নয় যে তাদের আইনী অধিকার নেই, তারা সার্ভিস বেনিফিট বা অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার অধিকারী নন।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রিয় কারখানার মালিক, আপনার প্রিয় প্রতিষ্ঠানটিকে এরাই আগলে রাখেন। আপনার ব্যবসা টিকে থাকে এদের মেধা আর পরিশ্রমে। আইনের জটিল ধাঁধায় হারিয়ে না গিয়ে একটু মানবিক হয়ে চিন্তা করুন, এরাও মানুষ, এদেরও পরিবার আছে, আছে ভবিষ্যত নিরাপত্তার প্রয়োজন।

মধ্যবিত্ত এই মানুষগুলো খুব অভিমানি হয়, তাদের আত্মসম্মানের কারনে এরা নিজেদের শ্রমিকদের থেকে একটু আলাদা ভাবতে চান। আর তাই অাইনের আশ্রয় নিলে অধিকার আদায় হবে নিশ্চিত জেনেও আপনার বিরূদ্ধে আদালতে যান না তারা। অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে আপনাকে অভিশাপ দেয়া ছাড়া আর কিছুই করেননা।

আপনার কি উচিৎ তাদের এই আত্মসম্মানবোধের সুযোগ নেয়া? আপনার বিবেক কি বলে?

Comments

comments

About the Author:

মোঃ শরিফুল হাসান - মানবসম্পদ, প্রশাসন ও কমপ্লায়েন্স প্রফেশনাল, লেখক, পরামর্শক।

Comments are closed.

error: Content is protected !!