By October 3, 2017 Read More →

কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত কিছু আইনবিরোধী প্রথা

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের ধারনাটি বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত নতুন। এখনও বহু প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগ বলে কিছু নেই, আছে একটি প্রশাসনিক শাখা বা বিভাগ, যেখানে গতানুগতিক ও মনগড়া কিছু ধারনা দিয়ে কর্মীদের নিয়োগ ও পরিচালনা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপকরা দিনে যতবার “ডিসিপ্লিন” শব্দটা উচ্চারন করেন, বছরেও ততবার “এমপ্লয়ী মোটিভেশন” শব্দটা তাদের মুখে আসেনা।

এসব প্রতিষ্ঠানে নেই কোন আইনের চর্চা, আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রচেষ্টার কথা তো অনেক দুরের কথা। ফলাফল ডিমোটিভেটেড এমপ্লয়ি ও অসুস্থ্য কর্মপরিবেশ।

সঠিক মানবসম্পদ কার্যকলাপের অনুপস্থিতি বা অন্য যে কারনেই হোক না কেন, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচন্ড অনৈতিক কিছু অনিয়মের চর্চা আছে। উন্নত দেশ হলে এসব ব্যাপারে মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের মামলা খেতে হত এবং কড়ায় গন্ডায় জরিমানা পরিশোধ করতে হত।

আমাদের দেশে নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী যেটা হয় সেটা হচ্ছে বৈষম্য (Discrimination), জোর-জবস্তি শ্রম (Forced Labor), নিপীড়ন (Harassment) ও নিয়োগ পদ্ধতির ব্যতিক্রম।

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার, আমাদের অনেক নামীদামী প্রতিষ্ঠানের অনেক নামীদামী মানবসম্পদ প্রফেশনালরাও বুঝে কিংবা না বুঝে এই অনৈতিক কাজগুলো করে যাচ্ছেন।

আসুন এরকম কিছু ব্যাপারে আলোচনা করা যাক।

বৈষম্য

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ি, It is illegal for an employer to discriminate against a job applicant because of his or her race, color, religion, sex (including gender identity, sexual orientation, and pregnancy), national origin, age (40 or older), disability or genetic information. For example, an employer may not refuse to give employment applications to people of a certain race.

অর্থাৎ, নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, লিংগ, গর্ভাবস্থা, জাতীয়তা, বয়স কিংবা পংগুত্ব সাপেক্ষে কোনো রকম বৈষম্য করা নিষিদ্ধ। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত বৈষম্য করে যাচ্ছি। কয়েকটি উদাহরন আলোচনা করা যাক।

১) Only retired army personnel can apply for this position.

সাধারনতঃ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলোতে মানবসম্পদ, প্রশাসন বা কমপ্লায়েন্স বিভাগে উচ্চপদে লোক নিয়োগ করার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি দেখা যায়। এটি সরাসরি বৈষম্য ও আইনবিরোধী।

আসল কথাটা হচ্ছে, কোনো কাজের জন্য যদি সমাজের বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ যোগ্য হয়, তবে আপনি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো বিশেষ শ্রেনীর মানুষকে চাকরী দিতে চাইতে পারবেন না।

২) শুধুমাত্র নারীরা আবেদন করতে পারবেন।

এটিও কিছুকিছু ক্ষেত্রে আইন বিরোধী। সাধারনতঃ দেখা যায় পারসোনাল সেক্রেটারি বা রিসেপশনিস্ট টাইপের পদগুলোতে নারী প্রার্থীর কথা উল্লেখ করা হয়, অথচ একজন পুরুষ এইসব পদে দিব্যি কাজ করতে পারে।

তবে, যদি এমন কোনো পদ থাকে যেটাতে শুধু নারীরাই কাজ করতে সক্ষম, তবে সেক্ষেত্রে বাধা নেই। যেমন, কারখানাগুলোতে মেয়েদের টয়লেট পরিস্কার করার কাজ একজন নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী হওয়া চাই।

৩) কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বিষয় পড়ানোর জন্য ঐ ধর্মেরই লোক নিতে হবে।

না, এটা কমনসেন্সের সমর্থন পেলেও এই নিয়ে বাধ্যবাধকতা থাকাটা আইনবিরোধী। একজন মুসলিম খ্রিস্টধর্ম পড়াতে কোনো বাধা নেই, যদি তার সেই শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে।

৪) প্রার্থীকে সুদর্শন/সুশ্রী/সুন্দরী হতে হবে

এটা সরাসরি আইনের লংঘন। নিয়োগ বা নিয়োগের বিজ্ঞাপনে চেহারা বা গায়ের রং-এর কারনে কোনো ভাবে বৈষম্য করার সুযোগ নেই।

৫) শারীরিক সুস্থ্যতা বা অভ্যাস

যেসব চাকরীতে শারীরিকভাবে পূর্ণ কর্মক্ষমতার দরকার পড়েনা, সেসব চাকুরীতে পংগুদের না নেয়া, কিংবা ধূমপায়ীদের আবেদন করার প্রয়োজন নেই, এসব কথা বলাটা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী।

৬) এখানে ১৮ বছরের কম বয়সী কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়না

সাধারনতঃ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর মূল দরজার পাশে এই কথাটা লেখা থাকতে দেখা যায়। আইন মতে, ১৪-১৮ বছর বয়সীরা কিশোর ও নিয়োগযোগ্য। সুতরাং এই কথাটি বৈষম্যের আওতায় পড়ে। সঠিক ভাষাটি হবে – এখানে শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়না।

৭) অমুক দেশের নাগরিকদের আবেদন করার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে

এটা শুধু আইনবিরোধীই নয়, এটা অযৌক্তিক এবং জাতিগতভাবে হীনমন্যতার প্রকাশ। ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্টগুলোতে, বিশেষকরে গার্মেন্টস সেক্টরে এই প্রবনতা দেখা যায়। এই সেক্টরটিতে শ্রীলংকান ও ভারতীয়দের সংখ্যা অযৌক্তিকভাবে বেশী। এতে করে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, পাচার হচ্ছে টাকা, দেশীয় মেধার মূল্যায়ন হচ্ছেনা, কর্ম পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা বেঅাইনী।

জোর-জবস্তিমূলক শ্রম (Bonded Labor / Forced Labor)

আপনি চাকরী পেলে কত বছর আমাদের কোম্পানীতে থাকবেন? আমাদের কাছে আপনার সার্টিফিকেটগুলো জমা রাখতে হবে। – এসবই জোর-জবস্তিমূলক শ্রমের আওতাভূক্ত। এছাড়াও, কমপক্ষে রাত ৮/৯ টা পর্যন্ত অফিস করতে হবে, না হলে আপনার পারফর্মেন্স ভালো বলে বিবেচনা করা হবে না, এটাও তাই।

নিপীড়ন (Harassment)

যৌন নিপীড়ন চাকরীক্ষেত্রে বাংলাদেশে অহরহ ঘটে। কিন্তু আরো অনেক নিপীড়ন আছে। তার মধ্যে একটা বড় নিপীড়ন হল ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানা। যেমন, কোনো পর্দাশীল নারী সিকিউরিটি গার্ডকে এমন ইউনিফর্ম পরতে বাধ্য করা যেটা তার ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যায় না।

নিয়োগ পদ্ধতির ব্যতিক্রম (Violation of recruitment law)

আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমাকে আমি নিলাম। আগামীকাল থেকে কাজ কর, একমাস তোমার কাজ দেখি, তারপর তোমার বেতন ধরবো, রাজী?

বেচারা বেকার যুবক, রাজী হওয়া ছাড়া আর কোনো গতি আছে তার? অথচ শ্রম আইন অনুযায়ি, নিয়োগপত্র ছাড়া কাউকে নিয়োগ প্রদান করা যায়না। এবং নিয়োগপত্রে অবশ্যই বেতন, সুবিধাদি ও অন্যান্য শর্তাবলীর কথা উল্লেখ থাকতে হবে।

এসব কিছু ছাড়াও আরো অনেক উদাহরন আছে যেই বেআইনী কাজগুলো নিয়োগের সময় চাকরীপ্রার্থীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আমরা করে থাকি। সেই সব ঘটনা নিয়ে আমরা পরবর্তীতে আলোচনা করবো।

Comments

comments

About the Author:

মোঃ শরিফুল হাসান - মানবসম্পদ, প্রশাসন ও কমপ্লায়েন্স প্রফেশনাল, লেখক, পরামর্শক।

Comments are closed.

error: Content is protected !!